বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এজেন্ট হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলল — “আপনার ওয়ার্ক পারমিট এসে গেছে, এবার টাকা জমা দিন।” ঠিক এই মুহূর্তটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ কাগজটা আসল নাকি নকল, তা না জেনে টাকা দিলে বা বিদেশের মাটিতে পা রাখলে বিপদ আপনার একারই। সরাসরি উত্তরটা আগে দিই: হ্যাঁ, ওয়ার্ক পারমিট চেক করা যায়। পারমিট বা রেফারেন্স নম্বর দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ইমিগ্রেশন বা শ্রম বিভাগের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে অনলাইনে যাচাই করা যায়; যে দেশের অনলাইন ব্যবস্থা নেই, সেখানে ওই দেশের দূতাবাস, বাংলাদেশের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) বা আপনার জেলা জনশক্তি অফিসের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব। আমার এক পরিচিত ভাই কয়েক বছর আগে একটা “পারমিট” হাতে পেয়ে প্রায় দুই লাখ টাকা দিয়ে ফেলেছিলেন — শেষ মুহূর্তে যাচাই করে দেখা গেল ওই নামে কোনো পারমিটই ইস্যু হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার পর থেকে আমি সবাইকে একটা কথাই বলি — পারমিট হাতে পাওয়া মানেই কাজ শেষ নয়, যাচাই করাই আসল কাজ। এই লেখায় আমি ধাপে ধাপে দেখিয়েছি ওয়ার্ক পারমিট কিভাবে চেক করবেন, কোন তথ্যগুলো মেলাবেন, নকল পারমিট চেনার লক্ষণ কী, আর যাচাইয়ের পর পরের ধাপগুলো কী।
১. ওয়ার্ক পারমিট আসলে কী ও কেন চেক করা জরুরি

ওয়ার্ক পারমিট মানে হলো কোনো দেশের সরকারের পক্ষ থেকে একজন বিদেশি নাগরিককে সেই দেশে নির্দিষ্ট কাজে, নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করার আইনি অনুমতি। সহজ করে বললে — ভিসা হলো দেশে ঢোকার অনুমতি, আর ওয়ার্ক পারমিট হলো সেখানে কাজ করার অনুমতি। বেশিরভাগ দেশে এই দুটো একসাথে চলে: নিয়োগকর্তা প্রথমে শ্রম কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আপনার নামে পারমিট বা অনুমোদন বের করেন, তারপর সেই অনুমোদনের ভিত্তিতে ভিসা হয়। পারমিটে সাধারণত আপনার নাম, পাসপোর্ট নম্বর, পেশা, নিয়োগকর্তা বা স্পনসর কোম্পানির নাম, কাজের ধরন আর মেয়াদ লেখা থাকে।
কেন যাচাই এত জরুরি? কারণ এই খাতে প্রতারণার সবচেয়ে বড় হাতিয়ারই হলো ভুয়া কাগজ। কম্পিউটারের দোকানে বানানো একটা রঙিন কপি দেখতে হুবহু আসলের মতো লাগতে পারে। নকল পারমিট নিয়ে আপনি তিনভাবে বিপদে পড়তে পারেন। প্রথমত, টাকা দিয়ে ফেললে সেই টাকা প্রায় কখনোই ফেরত আসে না — দালাল উধাও হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, ভুয়া কাগজে ভিসা আবেদন করলে দূতাবাসে ধরা পড়ে আপনার পাসপোর্টে এমন রেকর্ড হতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে সত্যিকারের সুযোগও নষ্ট হয়। তৃতীয়ত, কোনোভাবে পৌঁছে গেলেও কাজের অনুমতি না থাকায় আপনি সেখানে অবৈধ হয়ে থাকবেন — জরিমানা, জেল বা দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি। তাই পারমিট চেক করা কোনো অতিরিক্ত সতর্কতা নয়, এটা বিদেশ যাওয়ার প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আমার নিয়ম খুব সহজ — যাচাই ছাড়া এক টাকাও অতিরিক্ত দেব না, এক পা-ও এগোবো না।
২. ওয়ার্ক পারমিট কিভাবে চেক করব – অনলাইনে যাচাইয়ের সাধারণ ধাপ

বেশিরভাগ বড় গন্তব্য দেশেই এখন অনলাইনে পারমিট বা ভিসা আবেদনের অবস্থা যাচাইয়ের ব্যবস্থা আছে। দেশভেদে ওয়েবসাইট ও পদ্ধতি আলাদা হলেও মূল ধাপগুলো প্রায় একই রকম। ধাপ এক: পারমিটের কাগজে থাকা নম্বরটা চিহ্নিত করুন — এটা হতে পারে পারমিট নম্বর, রেফারেন্স নম্বর, অ্যাপ্লিকেশন নম্বর বা স্পনসরের দেওয়া অনুমোদন নম্বর। ছবি তুলে মোবাইলে রেখে দিন, যাতে নম্বরটা হারিয়ে না যায়। ধাপ দুই: সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ওয়েবসাইটে যান — শ্রম মন্ত্রণালয়, ইমিগ্রেশন বিভাগ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল পোর্টাল। মনে রাখবেন, আসল সরকারি সাইটের ঠিকানায় সাধারণত gov বা সরকারি ডোমেইনের ছাপ থাকে; এজেন্টের পাঠানো অদ্ভুত নামের লিংকে কখনোই ভরসা করবেন না — নিজে গুগলে দেশের নাম ও “official immigration” লিখে খুঁজে অফিসিয়াল সাইটে ঢুকুন। ধাপ তিন: পোর্টালের “ভিসা/পারমিট স্ট্যাটাস” বা “অ্যাপ্লিকেশন ইনকোয়ারি” ধরনের অপশনে আপনার পারমিট নম্বর ও পাসপোর্ট নম্বর বসান। অনেক পোর্টালে জন্মতারিখ বা জাতীয়তাও লাগে। ধাপ চার: ফলাফল মন দিয়ে পড়ুন — আপনার নাম, পেশা, কোম্পানির নাম আর স্ট্যাটাস (অনুমোদিত/প্রক্রিয়াধীন) দেখা যাচ্ছে কিনা দেখুন। স্ক্রিনশট নিয়ে রাখুন।
কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ দিই। কম্পিউটারের দোকান বা অন্যের ফোনে এই যাচাই করলে নিজের তথ্যের ছবি তুলে রাখুন, কারণ পরে বিতর্ক হলে এটাই প্রমাণ। ফলাফলে “কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি” এলে সঙ্গে সঙ্গে ঘাবড়াবেন না — নতুন ইস্যু করা পারমিট সিস্টেমে উঠতে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে; ৫-৭ দিন পর আবার চেক করুন, তখনো না মিললে ধরে নিন সমস্যা আছে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা — টাইপ করার সময় নম্বরের একটা ডিজিট ভুল হলেও রেকর্ড মিলবে না, তাই নম্বরটা কাগজ দেখে ধীরে ধীরে মিলিয়ে লিখুন। যাচাই নিজে করতে না পারলে বিশ্বস্ত কম্পিউটার-জানা কারো সাহায্য নিন, কিন্তু এজেন্টকে দিয়ে যাচাই করাবেন না — চোরকে দিয়ে তালা পরীক্ষা করানো যায় না।
যাচাইয়ের ফলাফলে সাধারণত তিন ধরনের অবস্থা দেখা যায় — অনুমোদিত (approved), প্রক্রিয়াধীন (in process) আর বাতিল বা আবেদন হয়নি (no record / rejected)। “প্রক্রিয়াধীন” দেখালে হতাশ হওয়ার কিছু নেই; এর মানে আবেদনটা সিস্টেমে আছে, সিদ্ধান্ত বাকি। এই অবস্থায় এজেন্টকে বলুন লিখিতভাবে জানাতে কতদিন লাগতে পারে, আর নিজে সপ্তাহে একবার করে আবার চেক করুন। তবে “প্রক্রিয়াধীন” দেখিয়ে মাসের পর মাস ঘোরালে এবং এজেন্ট বারবার নতুন তারিখ দিলে সেটা আলাদা সতর্কতার বিষয়। আরেকটা ছোট্ট কিন্তু কাজের অভ্যাস বলি — যাচাইয়ের তারিখ ও ফলাফল একটা খাতায় বা ফোনের নোটে লিখে রাখুন। পরে কেউ জিজ্ঞেস করলে বা বিতর্ক হলে এই ধারাবাহিক রেকর্ডটাই আপনার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হবে। সম্ভব হলে পরিবারের আরেকজনকে দিয়েও একবার স্বাধীনভাবে যাচাই করিয়ে নিন — দুজনের ফল মিললে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।
৩. দেশভেদে চেক করার পথ আলাদা – কোন দেশে কোন পথে যাবেন

“ওয়ার্ক পারমিট কিভাবে চেক করব” — এই প্রশ্নের উত্তর দেশ অনুযায়ী বদলে যায়, কারণ প্রতিটা দেশের ব্যবস্থা আলাদা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে (সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত) সাধারণত স্পনসর বা কাফিলভিত্তিক ব্যবস্থা চলে; অনেক দেশের স্বরাষ্ট্র বা শ্রম মন্ত্রণালয়ের পোর্টালে পাসপোর্ট নম্বর বা ভিসা নম্বর দিয়ে স্ট্যাটাস দেখা যায়, আর কোনো কোনো দেশে মোবাইল অ্যাপেও যাচাইয়ের সুযোগ আছে। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন বিভাগের অনলাইন সিস্টেমে আবেদন বা পারমিটের অবস্থা দেখার ব্যবস্থা আছে; কলিং ভিসা বা অনুমোদনের চিঠি হাতে পেলে সেখানকার তথ্যের সাথে মিলিয়ে দেখা যায়। ইউরোপের দেশগুলোতে (ইতালি, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, পর্তুগাল ইত্যাদি) নিয়োগকর্তা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ওয়ার্ক পারমিট বা অনুমোদন বের করেন; অনেক দেশে আবেদনের রেফারেন্স নম্বর দিয়ে অনলাইনে অবস্থা জানা যায়, আর কিছু দেশে নিয়োগকর্তা বা দূতাবাসের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে হয়। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে (দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান) ব্যবস্থা আরও নিয়মতান্ত্রিক — কোরিয়ার ক্ষেত্রে যেমন নির্দিষ্ট সরকারি পোর্টালে আবেদনের অবস্থা যাচাই করা যায়।
যে দেশের অনলাইন যাচাইয়ের ব্যবস্থা খুঁজে পাচ্ছেন না, সেখানে তিনটা বিকল্প পথ সবসময় খোলা। এক: ওই দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটের শ্রম শাখায় যোগাযোগ — তারা নিয়োগ ও পারমিটের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারে। দুই: ঢাকার বিএমইটি বা নিজ জেলার জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিস — বিদেশগামী কর্মীদের কাগজপত্র যাচাইয়ে এরা দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিন: নিয়োগকর্তা কোম্পানিকে সরাসরি ইমেইল বা ফোন করে আপনার পারমিটের অবস্থা জানতে চাওয়া — আসল কোম্পানি হলে তারা নিশ্চিত করবে, ভুয়া হলে এখানেই গণ্ডগোল ধরা পড়বে। মনে রাখবেন, দেশ যেটাই হোক, যাচাইয়ের মূলনীতি একটাই — তথ্যটা আসতে হবে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে, এজেন্টের মুখের কথা থেকে নয়।
৪. পারমিটের কোন তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখবেন

অনলাইনে স্ট্যাটাস “অনুমোদিত” দেখালেই কাজ শেষ নয় — বিস্তারিত তথ্য একটা একটা করে মেলাতে হবে, কারণ অনেক প্রতারণায় আসল একজনের পারমিটের নম্বর ধার করে অন্যের নাম বসিয়ে দেওয়া হয়। প্রথমে নাম মেলান: পারমিটে আপনার নামের বানান যেন পাসপোর্টের বানানের সাথে হুবহু মেলে — একটা অক্ষর এদিক-ওদিক হলেও বিমানবন্দর বা ইমিগ্রেশনে আটকে যেতে পারেন। দ্বিতীয়ত, পাসপোর্ট নম্বর: পারমিট যে পাসপোর্টের বিপরীতে ইস্যু হয়েছে, সেটা যেন আপনার বর্তমান পাসপোর্টই হয়; পাসপোর্ট নবায়ন করে থাকলে পুরনো নম্বরে ইস্যু করা পারমিট ঝামেলা করতে পারে। তৃতীয়ত, পেশা বা কাজের ধরন: যে কাজের কথা বলে টাকা নেওয়া হয়েছে, পারমিটে সেই পেশাই আছে তো? ড্রাইভারের কথা বলে অনেককে শ্রমিকের পারমিট ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা অহরহ। চতুর্থত, নিয়োগকর্তা বা কোম্পানির নাম — কোম্পানিটা আসলেই আছে কিনা, সেই দেশের ব্যবসায়িক রেজিস্ট্রিতে নাম আছে কিনা, গুগলে খুঁজে দেখুন। পঞ্চমত, মেয়াদ ও ইস্যুর তারিখ: পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যাত্রা করতে হবে; ইস্যুর তারিখ অস্বাভাবিকভাবে পুরনো বা ভবিষ্যতের হলে সন্দেহ করুন।
আরও দুটো খুঁটিনাটি দেখুন — পারমিটে আপনার ছবি থাকলে সেটা আপনার ছবিই কিনা, আর বেতন বা চুক্তির শর্তের উল্লেখ থাকলে সেটা মুখে বলা অফারের সাথে মেলে কিনা। সব মিলিয়ে দেখার পর কোথাও গরমিল পেলে সঙ্গে সঙ্গে এজেন্টকে লিখিতভাবে (মেসেজে) জিজ্ঞেস করুন কেন — তার উত্তর ও আপনার যাচাইয়ের স্ক্রিনশট, দুটোই সংরক্ষণ করুন। আমার অভিজ্ঞতা বলে, তথ্য মেলানোর এই ১০ মিনিটের কাজটাই লাখ টাকার ক্ষতি ঠেকিয়ে দেয়।
আধুনিক অনেক দেশের পারমিটে এখন QR কোড বা বারকোড থাকে। মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে স্ক্যান করলে সেটা সরকারি যাচাইয়ের পেজে নিয়ে যাওয়ার কথা — স্ক্যান করে যদি অদ্ভুত কোনো ওয়েবসাইটে যায় বা কিছুই না আসে, সেটা সন্দেহের বড় কারণ। তবে শুধু QR কোড থাকলেই খুশি হবেন না; প্রতারকরাও নকল কোড বসাতে পারে, তাই কোডের গন্তব্যটা সরকারি ডোমেইন কিনা সেটাই আসল পরীক্ষা। এছাড়া স্পনসর বা কোম্পানির লাইসেন্স নম্বর থাকলে সেটাও সংশ্লিষ্ট দেশের বাণিজ্যিক রেজিস্ট্রিতে মিলিয়ে দেখা যায়। সবশেষে একটা সহজ পরীক্ষা — পারমিটের তথ্য দিয়ে গুগলে কোম্পানির নাম ও ঠিকানা খুঁজুন; আসল কোম্পানির ওয়েবসাইট, ফোন নম্বর ও অবস্থান সাধারণত খুঁজে পাওয়া যায়, ভুয়া নামের কোনো অস্তিত্বই মেলে না।
৫. নকল ওয়ার্ক পারমিট চেনার লক্ষণগুলো

সিস্টেমে রেকর্ড না মিললেই যে পারমিট নকল, তা নয় — আবার রেকর্ড মিললেও সব নিরাপদ নয়। তাই কাগজটা হাতে নিয়ে কিছু লক্ষণ দেখে নিজেই প্রাথমিক ধারণা পেতে পারেন। লক্ষণ এক: অতিরিক্ত তাড়া। “আজই টাকা না দিলে পারমিট বাতিল হয়ে যাবে” — এই চাপ দেওয়াটাই প্রতারণার সবচেয়ে পরিচিত কৌশল; আসল প্রক্রিয়ায় এমন আকস্মিক সময়সীমা থাকে না। লক্ষণ দুই: যাচাইয়ে বাধা। আপনি অনলাইনে চেক করতে চাইলে বা কাগজের ছবি চাইলে এজেন্ট রাগ করে, অজুহাত দেয় (“সিস্টেমে এখনো ওঠেনি, ওঠবে না”) বা হুমকি দেয় — সৎ এজেন্ট যাচাইকে স্বাগত জানায়। লক্ষণ তিন: কাগজের মান ও গঠন। অস্পষ্ট ছাপা, ঝাপসা সিল-স্বাক্ষর, একেক জায়গায় একেক ফন্ট, বানান ভুলে ভরা ইংরেজি — এগুলো ঘরে বানানো কাগজের লক্ষণ। লক্ষণ চার: অস্বাভাবিক প্রতিশ্রুতি। বয়স, যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা ছাড়াই “গ্যারান্টিসহ” বড় বেতনের চাকরি, বা বাজারের চেয়ে অস্বাভাবিক কম খরচে ইউরোপের পারমিট — বাস্তবে এমন জাদু নেই। লক্ষণ পাঁচ: টাকা নেওয়ার পদ্ধতি। ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে বা অপরিচিত নামের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে বলা, রসিদ দিতে অনীহা — সঠিক রিক্রুটিং এজেন্সি লাইসেন্স নম্বরসহ প্রতিষ্ঠানের নামে রসিদ দেয়। লক্ষণ ছয়: তথ্যের গরমিল। মুখে এক দেশের নাম, কাগজে আরেক কোম্পানি; বেতনের অঙ্ক প্রতিবার বদলে যাওয়া। লক্ষণ সাত: সরকারি ফি এড়িয়ে “সরাসরি ব্যবস্থা” করার প্রলোভন — যেকোনো শর্টকাট প্রস্তাব মানেই বিপদের ঘণ্টা।
একটা কথা মনে রাখুন — এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটা দেখা মানেই নিশ্চিত প্রতারণা নয়, কিন্তু দুই-তিনটা একসাথে মিললেই থেমে যান, টাকা আটকে দিন এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করুন। বিএমইটির হটলাইনে বা জেলা জনশক্তি অফিসে গিয়ে ঘটনাটা জানালে তারা পরামর্শ দেবে। আর ইতিমধ্যে টাকা দিয়ে ফেললে সব কাগজ, মেসেজের স্ক্রিনশট ও লেনদেনের প্রমাণ জোগাড় করে থানায় বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করুন — প্রমাণ যত শক্ত, ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তত বেশি।
৬. এজেন্ট বা দালাল পারমিট দিলে যেভাবে যাচাই করবেন

বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মানুষ কোনো না কোনো এজেন্ট বা রিক্রুটিং এজেন্সির সাহায্য নেন — এতে দোষের কিছু নেই, দোষ হলো যাচাই না করে অন্ধ বিশ্বাসে। পারমিট হাতে পাওয়ার পর এই ক্রমটা অনুসরণ করুন। প্রথমে এজেন্সির বৈধতা দেখুন: রিক্রুটিং এজেন্সির বিএমইটি লাইসেন্স আছে কিনা, লাইসেন্স নম্বরটা বিএমইটির তালিকায় মিলিয়ে দেখুন; লাইসেন্সবিহীন “এজেন্ট” মানেই বাড়তি ঝুঁকি। এরপর পারমিটের মূল কপি বা পরিষ্কার স্ক্যান কপি চেয়ে নিন — শুধু মোবাইলে তোলা আংশিক ছবি দিয়ে কখনো সিদ্ধান্ত নেবেন না; পুরো কাগজটা হাতে নিয়ে প্রতিটা তথ্য পড়ুন। তারপর নিজে বা বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে আগের সেকশনের নিয়মে অনলাইন যাচাই করুন — এজেন্টকে বলবেন না যে আপনি যাচাই করছেন; ফলাফল নিজের কাছে রাখুন। যাচাই মিলে গেলে চুক্তির কাগজে সব শর্ত লিখিত নিন: মোট খরচ কত, কোন ধাপে কত টাকা, কাজ না হলে ফেরতের নিয়ম কী — মৌখিক প্রতিশ্রুতির কোনো দাম নেই। টাকা দেওয়ার সময় ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের নামে লেনদেন করুন এবং প্রতিবার রসিদ সংগ্রহ করুন; কিস্তিতে টাকা দিলে প্রতিটা কিস্তির হিসাব লিখে রাখুন।
আরেকটা কার্যকর কৌশল বলি — একই এজেন্টের মাধ্যমে আগে গেছেন এমন কারো সাথে কথা বলুন, সম্ভব হলে দুজনের সাথে। তারা আসলেই গিয়ে কাজ পেয়েছেন কিনা, বেতন মিলেছে কিনা — এই তথ্য কোনো কাগজের চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য। আর পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে পরিবারের একজনকে সবকিছুর কপি দিয়ে রাখুন; প্রবাসে যাওয়ার মতো বড় সিদ্ধান্তে প্রমাণের ডুপ্লিকেট কপি থাকা জরুরি। শেষ কথা এই সেকশনের — ভালো এজেন্ট আপনার যাচাইয়ে বিরক্ত হবে না, বরং নিজেই কাগজপত্র পরিষ্কার করে দেবে; যে বিরক্ত হয়, তার থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ।
আরও একটা বিষয় আগেই পরিষ্কার করে নিন — মোট খরচের ধাপভিত্তিক হিসাবটা লিখিতভাবে চেয়ে নিন: পারমিটের ধাপে কত, ভিসার ধাপে কত, মেডিকেল ও টিকিটে কত। সৎ এজেন্সি এই হিসাব দিতে দ্বিধা করে না, কিন্তু প্রতারকরা সবসময় “মোট এত, বাকিটা পরে দেখা যাবে” ধরনের ধোঁয়াশা রাখতে চায় — কারণ ধোঁয়াশাই তাদের বাড়তি টাকা আদায়ের জায়গা। প্রতিটা ধাপ শেষ হওয়ার পর পরের ধাপের টাকা দেওয়ার আগে আগের ধাপের কাগজ নিজে যাচাই করে নিন; এই অভ্যাসটা থাকলে প্রক্রিয়ার যেকোনো পর্যায়ে থেমে যাওয়ার সিদ্ধান্তও আপনি নিরাপদে নিতে পারবেন, কারণ আপনার টাকার বড় অংশ তখনো আপনার হাতেই থাকবে।
৭. পারমিট ঠিক থাকলে পরের ধাপ – ভিসা, বিএমইটি ছাড়পত্র ও যাত্রা

যাচাইয়ে পারমিট আসল প্রমাণিত হলে আনন্দের পাশাপাশি পরের ধাপগুলো গুছিয়ে নিন, কারণ অনেকেই এই ধাপে এসে তাড়াহুড়োয় ভুল করেন। ধাপ এক: ভিসা প্রক্রিয়া। পারমিটের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা নির্ধারিত কেন্দ্রে ভিসার আবেদন হয় — অনেক ক্ষেত্রে এজেন্সিই এটা করে দেয়, তবে পাসপোর্ট কোথায় জমা আছে, আবেদনের রসিদ কী — এগুলো নিজে জেনে রাখুন এবং ভিসা স্ট্যাটাস নিজেও যাচাই করুন। ধাপ দুই: মেডিকেল পরীক্ষা। নির্ধারিত অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার থেকেই পরীক্ষা করান এবং রিপোর্টের কপি নিজের কাছে রাখুন। ধাপ তিন: প্রশিক্ষণ। প্রথমবার বিদেশগামী কর্মীদের জন্য নির্ধারিত প্রাক-বিদেশগমন প্রশিক্ষণ (সাধারণত তিন দিনের) সম্পন্ন করতে হয় — এখানে গন্তব্য দেশের নিয়ম, ভাষা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়, ফাঁকি দেবেন না। ধাপ চার: বিএমইটির ছাড়পত্র ও স্মার্ট কার্ড। সব কাগজ ঠিক থাকলে বিএমইটি থেকে ছাড়পত্র মিলবে — বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে এই ছাড়পত্র ছাড়া কর্মী হিসেবে যাত্রা করা যায় না, তাই এই ধাপটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধাপ পাঁচ: টিকিট ও যাত্রা। যাত্রার আগে সব মূল কাগজের দুটো করে ফটোকপি ও মোবাইলে স্ক্যান কপি রাখুন; এক সেট পরিবারের কাছে রেখে যান।
আরেকটা জরুরি প্রস্তুতি — গন্তব্য দেশে পৌঁছে প্রথম যোগাযোগের ঠিকানা, নিয়োগকর্তার ফোন নম্বর আর বাংলাদেশ দূতাবাসের নম্বর কাগজে লিখে ব্যাগে রাখুন। মোবাইল হারালে বা সিম কাজ না করলে এই কাগজটাই ভরসা। আর বিমানবন্দরে কেউ “তাড়াতাড়ি করতে হবে” বলে অতিরিক্ত টাকা চাইলে দেবেন না — সব সরকারি ধাপ সম্পন্ন থাকলে অতিরিক্ত কোনো ফির প্রশ্নই ওঠে না।
যাত্রার আগের শেষ প্রস্তুতি হিসেবে প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের সদস্যপদ ও প্রযোজ্য বীমা সুবিধার বিষয়টা এজেন্সি ও জনশক্তি অফিস থেকে জেনে নিন — বৈধ পথে যাওয়া কর্মীদের জন্য এসব সুবিধা সাজানো থাকে, আর বিদেশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে পরিবারের জন্য এগুলোই সহায় হয়। পাশাপাশি নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল রেখে পরিবারের কাউকে নমিনি বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের ব্যবস্থা বুঝিয়ে যান, যাতে প্রবাস থেকে পাঠানো টাকা বৈধ পথে সহজে আসে। আর যাত্রার দিন বিমানবন্দরে পৌঁছান অন্তত তিন-চার ঘণ্টা আগে; কাগজপত্র হাতের ব্যাগে রাখুন, চেক-ইন লাগেজে কখনোই মূল কাগজ রাখবেন না।
৮. ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে সাধারণ ভুল ও প্রতারণা এড়ানোর নিয়ম

শেষে সেই ভুলগুলো একসাথে বলে দিই, যেগুলো আমি বারবার দেখেছি। ভুল এক: পরিচিত বলেই যাচাই না করা। আত্মীয় বা গ্রামের পরিচিত দালাল হলেও কাগজ যাচাই করুন — অনেক প্রতারণা হয় আস্থার সম্পর্ক ব্যবহার করেই, আর অনেকে নিজেরাও না জেনে ভুয়া চেইনের অংশ হয়ে যান। ভুল দুই: পুরো টাকা একবারে দিয়ে দেওয়া। ধাপে ধাপে, কাজের অগ্রগতি দেখে টাকা দিন; চুক্তিতে ফেরতের শর্ত লিখিত রাখুন। ভুল তিন: পাসপোর্ট অন্যের কাছে দীর্ঘদিন ফেলে রাখা। জমা দিলে রসিদ নিন, আর নিয়মিত খোঁজ নিন পাসপোর্ট কোথায় আছে। ভুল চার: ভিজিট ভিসায় গিয়ে কাজ খোঁজার প্রলোভনে পড়া। ভিজিট ভিসায় কাজ করা প্রায় সব দেশেই অবৈধ — ধরা পড়লে জরিমানা ও দেশে ফেরত অনিবার্য, আর ভবিষ্যতের দরজাও বন্ধ হয়। ভুল পাঁচ: শুধু ফেসবুক বিজ্ঞাপন দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। চোখে পড়া ঝকঝকে বিজ্ঞাপনের পেছনে লাইসেন্সহীন প্রতারক থাকে অহরহ — অফিসে গিয়ে, লাইসেন্স দেখে, আগের ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলে তবেই এগোন। ভুল ছয়: কাগজপত্রের কপি নিজের কাছে না রাখা। পারমিট, ভিসা, চুক্তি — প্রতিটার ছবি নিজের ফোনে ও পরিবারের কাছে রাখুন।
প্রতারণা এড়ানোর মূলমন্ত্রটা খুব সরল — প্রক্রিয়াটা সরকারি নিয়মে চললে প্রতিটা ধাপেরই কাগজ ও যাচাইয়ের পথ আছে; যেখানে যাচাইয়ের পথ বন্ধ, সেখানেই গণ্ডগোল। তাই তাড়াহুড়ো নয়, লোভ নয় — যাচাই, লিখিত চুক্তি আর ধাপে ধাপে এগোনোই নিরাপদ বিদেশযাত্রার একমাত্র রাস্তা। মনে রাখবেন, সতর্ক মানুষকে প্রতারণা করা প্রায় অসম্ভব।
শেষ কথা: ওয়ার্ক পারমিট কিভাবে চেক করব — এই প্রশ্নটা যিনি খোঁজেন, তিনি আসলে নিজের কষ্টের টাকা আর ভবিষ্যৎ বাঁচাতে চান। যাচাইয়ের কাজটা কঠিন নয়: পারমিট নম্বর নিয়ে সরকারি পোর্টালে দেখুন, তথ্যগুলো মিলিয়ে নিন, সন্দেহ হলে বিএমইটি বা দূতাবাসের সাহায্য নিন। মাত্র কয়েকদিনের এই সতর্কতাই আপনাকে লাখ টাকার ক্ষতি আর বছরের পর বছর ঘোরাঘুরি থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। আমার শুভকামনা রইল — আপনার বিদেশযাত্রা হোক নিরাপদ, বৈধ আর সফল। লেখাটি কাজে লাগলে পরিবারের বা পরিচিত যিনি বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁর সাথে শেয়ার করুন — হয়তো আপনার একটা শেয়ারই তাঁকে বড় প্রতারণা থেকে বাঁচিয়ে দেবে।
